আহ, সঙ্গীতের জগতটা কি বৈচিত্র্যময় আর রহস্যে ভরা! কখনও কখনও কিছু সুর আমাদের এমন এক অতীতে নিয়ে যায়, যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল মুগ্ধ হয়ে শুনি আর ভাবি, “আহা, কী অসাধারণ ছিল সেই সময়টা!” আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যখন প্রথম বারোক সঙ্গীতের গভীরতা আর বিশালতার সাথে পরিচয় হয়েছিল, আমি যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। সেই অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের যে সুরের ধারা, তা যেন শুধু কিছু নোটের সমাহার নয়, বরং প্রতিটি ধাপে নাটকীয়তা, আবেগ আর এক ধরনের রাজকীয় জাঁকজমক মিশে আছে। এর জটিল কাঠামো, প্রতিটি যন্ত্রের স্বতন্ত্র উজ্জ্বলতা আর সম্মিলিত এক সুমধুর ঐক্যতান – সবকিছুই যেন শিল্পীর হাতের এক অনবদ্য সৃষ্টি। আজকালকার ফাস্ট-ফরোয়ার্ড জীবনেও যখন কানে আসে বাখের ফুগা বা ভিভাল্ডির ঋতুচক্রের সুর, মনটা কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়, এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে ওঠে। মনে হয়, কত যত্নে, কত গভীর ভাবনা আর অনুভূতি দিয়ে এই সুরগুলো তৈরি হয়েছিল, যা আজও আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। এই সঙ্গীত শুধু কানের জন্য নয়, আত্মার খোরাক। এর আবেদন সময়ের সাথে একটুও ফুরোয়নি, বরং দিনে দিনে যেন এর মূল্য আরও বাড়ছে। আমার মনে হয়, এই ধরনের সঙ্গীতই আমাদের ব্যস্ত জীবনের এক টুকরো শান্তি এনে দিতে পারে।আসুন, এই বারোক সঙ্গীতের অসাধারণ জগত সম্পর্কে আরও বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
বারোক সঙ্গীতের সুরের জালে মন হারানো: আমার প্রথম অভিজ্ঞতা
সত্যি বলতে কি, যখন প্রথম বারোক সঙ্গীতের জগতে পা রেখেছিলাম, আমার ধারণা ছিল এটা বুঝি শুধু প্রাচীন কিছু সুরের সমষ্টি, যা হয়তো আজকের দিনে খুব একটা প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার সেই ধারণা নিমেষেই ভেঙে গিয়েছিল। প্রথমবার যখন বাখের “Brandenburg Concerto” শুনলাম, মনে হয়েছিল যেন এক বিরাট সুরের সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যার গভীরতা আর বিশালতা আমাকে একেবারে অভিভূত করে তুলেছে। প্রতিটি নোট, প্রতিটি যন্ত্রের আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বর যেন এক সাথে মিলেমিশে এক অসাধারণ গল্প বলছিল। সেই সময়ের সঙ্গীতশিল্পীরা যে কত যত্ন আর আবেগ দিয়ে এই সুরগুলো তৈরি করেছেন, তা ভাবতেই অবাক লাগে। আধুনিক জীবনের ফাস্ট-ফরোয়ার্ড তালে আমরা যখন সবকিছু দ্রুতগতিতে চাই, তখন বারোক সঙ্গীত যেন আমাদের বলে, “একটু থামুন, শ্বাস নিন, আর এই সৌন্দর্যটা অনুভব করুন।” আমার মনে আছে, প্রথমবার শুনতেই আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম, আর অনুভব করছিলাম যেন এক অন্য জগতে চলে গেছি, যেখানে শুধু সুর আর প্রশান্তি। আমার ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি আর আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আমি আগে কখনো অনুভব করিনি। সেই দিন থেকেই বারোক সঙ্গীত আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, এক নির্ভরতার প্রতীক যেন।
প্রথম শ্রবণের সেই অদ্ভুত ভালো লাগা
আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি তখন কলেজ পড়ুয়া। হঠাৎ করেই এক বন্ধুর থেকে একটা পুরনো সিডি হাতে পাই, যার কভারে লেখা ছিল “Baroque Masterpieces”। কৌতূহলবশত শুনতেই সেই প্রথম ধাক্কা! অর্কেস্ট্রার সেই গাম্ভীর্য, হার্পসিকর্ডের ট্রিং ট্রিং আওয়াজ আর ভায়োলিনের হৃদয়স্পর্শী সুর – সব মিলে যেন এক ঐশ্বরিক আবেশ তৈরি করেছিল। মনে হচ্ছিল যেন সুরের প্রতিটি স্তর আমার মন ছুঁয়ে যাচ্ছে, আত্মার গভীরে প্রবেশ করছে। এই অনুভূতিটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, অনেকটা যেন দীর্ঘ দিনের এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজে পাওয়ার মতো। বারোকের সুরের মধ্যে এমন একটা নাটকীয়তা আছে, এমন একটা আবেগ আছে, যা শুনলে মনে হয় যেন আপনি কোনো এক রাজকীয় দরবারে বসে আছেন আর আপনার সামনেই শিল্পীরা তাঁদের সেরাটা উজাড় করে দিচ্ছেন। সেই ভালো লাগা থেকেই শুরু হয়েছিল বারোক সঙ্গীতের প্রতি আমার ভালোবাসা।
কীভাবে এই সুর আমার মনকে বদলে দিল
বারোক সঙ্গীত শুধু আমার কানেই ভালো লাগেনি, আমার মনের জগতেও এক গভীর পরিবর্তন এনেছিল। আগে যেখানে আমার মন খুব অস্থির থাকত, ছোটখাটো বিষয়েই বিরক্ত হতাম, সেখানে এই সঙ্গীত আমাকে এক ধরনের মানসিক স্থিতি এনে দিয়েছে। এখন যখনই মনে হয় জীবনটা একটু দ্রুত চলছে বা একটু বিষণ্ণ লাগে, আমি বারোক সঙ্গীত শুনতে বসি। মনে হয় যেন সুরের এক বিশাল নদী আমার ভেতরের সব আবর্জনা ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। এর জটিল কাঠামো আর সুসংগঠিত ধারা আমাকে শেখায় যে জীবনের প্রতিটি অংশেরই একটা নিজস্ব গুরুত্ব আছে, আর সব কিছু মিলেমিশে এক অসাধারণ ঐক্যতান তৈরি করে। এই সঙ্গীত আমাকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে, আর জীবনের ছোট ছোট সৌন্দর্য উপভোগ করতে উৎসাহিত করেছে। আমি নিজে হাতে ব্যবহার করে দেখেছি, ঘুমোতে যাওয়ার আগে বা পড়ার সময় বারোক সঙ্গীত শুনলে মনোযোগ অনেক বাড়ে।
সময়কে জয় করা সুরের জাদুকররা: বাখ, হ্যান্ডেল আর ভিভাল্ডি
বারোক সঙ্গীতের কথা যখনই বলি, তখনই আমার মনে ভেসে ওঠে কিছু অবিস্মরণীয় নাম – জোহান সেবাস্তিয়ান বাখ, জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল আর আন্তোনিও ভিভাল্ডি। সত্যি বলতে, এই মানুষগুলো কেবল সুরকার ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা জাদুকর। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় সুর যেন প্রাণ পেত, জীবন্ত হয়ে উঠত। ভাবুন তো, প্রায় তিনশ বছর আগে বসে তাঁরা এমন সব সৃষ্টি করে গেছেন, যা আজও আমাদের মনকে সমানভাবে স্পর্শ করে! আমি নিজে বহুবার ভেবেছি, কী করে সম্ভব ছিল সেই সময়ে এত গভীর, এত জটিল আর এত আবেগপূর্ণ সঙ্গীত তৈরি করা? তাদের কাজগুলো শুধু কিছু নোটের সমষ্টি নয়, যেন এক একটি দর্শন, জীবনের গভীরে প্রবেশ করার এক একটি পথ। আমি যখনই বাখের ফুগা শুনি, মনে হয় যেন এক গণিতজ্ঞের জটিল সমীকরণ সমাধান করছি, যেখানে প্রতিটি ধাপে এক নতুন রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। আবার যখন হ্যান্ডেলের ‘মেসায়া’ শুনি, এক অদ্ভুত পবিত্রতা আর বিশালতায় মন ভরে ওঠে। আর ভিভাল্ডির ঋতুচক্র? সে তো যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ছবি, যেখানে আপনি সুরের মাধ্যমে বসন্তের কলতান, গ্রীষ্মের তীব্রতা, শরতের স্নিগ্ধতা আর শীতের রুক্ষতা অনুভব করতে পারবেন। এই তিন জাদুকর তাঁদের কাজ দিয়ে কেবল সঙ্গীতকেই সমৃদ্ধ করেননি, মানব সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা, যা বলে বোঝানো অসম্ভব।
বাখের ফুগা: সুরের এক জটিল জ্যামিতি
বাখের নাম শুনলেই আমার মনে আসে ‘ফুগা’। ফুগা যেন এক সুরের জ্যামিতি, যেখানে প্রতিটি রেখা বা সুর একটি নির্দিষ্ট নিয়মে এগিয়ে যায়, একে অপরের সাথে মিশে যায়, আবার আলাদা হয়ে নতুন এক রূপ নেয়। প্রথম যখন বাখের ফুগা শুনলাম, আমার মনে হয়েছিল এটা বুঝি খুব জটিল কিছু, যা সাধারণের বোধগম্য নয়। কিন্তু যতবার শুনেছি, ততবারই নতুন করে মুগ্ধ হয়েছি। প্রতিটি ভয়েস বা সুর কিভাবে একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার একসময় মিলেমিশে এক চমৎকার ঐক্যতান তৈরি করছে, তা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমি নিজে চেষ্টা করেছি এর কাঠামোটা বোঝার, আর বুঝেছি যে এর পেছনে রয়েছে এক গভীর পাণ্ডিত্য আর সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। বাখের ফুগা শুনতে বসলে আমার মনে হয়, যেন আমি কোনো এক রহস্যময় সুরের ধাঁধার সমাধান করছি, আর প্রতিটি ধাপে এক নতুন আবিষ্কারের আনন্দ পাচ্ছি। এ যেন শুধু কানের জন্য নয়, মনের জন্যও এক ব্যায়াম, যা আমাদের মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে উন্নত করে।
হ্যান্ডেলের বিশালতা: ঐশ্বরিক আর মানবিক সুরের মিশেল
জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল – এই নামটি শুনলেই আমার মনে পড়ে তাঁর বিশাল আর মহিমান্বিত সৃষ্টিগুলোর কথা। বিশেষ করে তাঁর ‘মেসায়া’ অরatorio, যা শুনলে আমার মনে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়। হ্যান্ডেলের সঙ্গীতে এমন একটা ঐশ্বরিক ছোঁয়া আছে, যা শুনলে মনটা আপনাআপনিই শান্ত হয়ে যায়। তবে তাঁর সঙ্গীত কেবল আধ্যাত্মিক নয়, মানবিক আবেগ আর নাটকের বিশালতায় পরিপূর্ণ। আমি যখন হ্যান্ডেলের অপেরা শুনি, তখন মনে হয় যেন আমি কোনো এক রাজকীয় নাটকের দর্শক, যেখানে প্রতিটি চরিত্রের আবেগ আর সংগ্রাম সুরের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। তাঁর কান্তাতা বা ওরচেস্ট্রাল স্যুটগুলোও সমানভাবে মুগ্ধ করার মতো। হ্যান্ডেলের সঙ্গীতে এমন এক ধরনের শক্তি আর জাঁকজমক আছে, যা আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। আমার মনে হয়, তাঁর সঙ্গীত যেন এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে তিনি সুরের রং দিয়ে জীবনের বিভিন্ন দিক ফুটিয়ে তুলেছেন – কখনও গম্ভীর, কখনও উচ্ছ্বসিত, কখনও বা গভীর আবেগপূর্ণ।
ভিভাল্ডির ঋতুচক্র: প্রকৃতির প্রতি সুরের অর্ঘ্য
আন্তোনিও ভিভাল্ডি, যাঁর নাম শুনলেই প্রথমেই মনে আসে ‘দ্য ফোর সিজনস’ বা ‘ঋতুচক্রের’ কথা। এই চারটি কনচের্তো আমার কাছে যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত ছবি। আমি যখন ‘বসন্ত’ শুনি, তখন মনে হয় যেন পাখি ডাকছে, নদী কলকল করে বয়ে যাচ্ছে আর চারিদিকে নতুন প্রাণের ছোঁয়া লাগছে। আবার ‘গ্রীষ্ম’ শুনলে অনুভব হয় যেন রোদের তীব্রতা আর তার মাঝে ঝোড়ো হাওয়ার মাতামাতি। ভিভাল্ডি কিভাবে কেবল চারটি ভায়োলিন কনচের্তো দিয়ে প্রকৃতির এত নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা ভাবতেই আমি অবাক হয়ে যাই। আমি নিজে বহুবার এই সুরগুলো শুনেছি, আর প্রতিবারই যেন নতুন করে প্রকৃতির সাথে একাত্ম অনুভব করি। এই সঙ্গীত আমাকে শেখায় যে কিভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় থেকেও বিশাল এক শিল্প সৃষ্টি করা যায়। ভিভাল্ডির সঙ্গীত শুধু আনন্দই দেয় না, একই সাথে প্রকৃতির প্রতি আমাদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা বাড়িয়ে তোলে। আমি মনে করি, এই সুরগুলো আমাদের মনকে যেমন সতেজ করে তোলে, তেমনই আমাদের কল্পনার জগৎকে আরও প্রসারিত করে।
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
|---|---|
| সময়কাল | প্রায় ১৬০০ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দ |
| প্রধান স্টাইল | কন্টাটা, ফুগা, কনচের্তো, অপেরা |
| গুরুত্বপূর্ণ কম্পোজার | জোহান সেবাস্তিয়ান বাখ, জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল, আন্তোনিও ভিভাল্ডি |
| প্রধান বাদ্যযন্ত্র | হার্পসিকর্ড, অর্গান, লাউট, ভায়োলিন পরিবার |
যন্ত্র আর সুরের মহাযুদ্ধ: বারোক অর্কেস্ট্রার কারিশমা
বারোক সঙ্গীত শুধু সুরকারের একক প্রতিভা নয়, এটি ছিল যন্ত্র আর সুরের এক অসাধারণ মহাযুদ্ধ, যেখানে প্রতিটি যন্ত্র তার নিজস্ব ক্ষমতা প্রমাণ করত, আবার সম্মিলিতভাবে এক অভাবনীয় ঐক্যতান তৈরি করত। আমার মনে হয়, বারোক অর্কেস্ট্রার গঠনশৈলীই এর অনন্যতার প্রধান কারণ। আজকালকার বিশাল অর্কেস্ট্রার মতো এটি ততটা বড় না হলেও, এর প্রতিটি যন্ত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর সুনির্দিষ্ট। বিশেষ করে হার্পসিকর্ড বা অর্গানের ভূমিকা ছিল একাধারে ছন্দ বজায় রাখা আর সুরের ভিত্তি তৈরি করা। আমি নিজে বহুবার অনুভব করেছি, কীভাবে হার্পসিকর্ডের ট্রিং ট্রিং শব্দ সুরের মধ্যে এক বিশেষ উজ্জ্বলতা এনে দেয়, যা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। আর ভায়োলিন পরিবারের সদস্যরা তো সুরের প্রাণ, তাদের আবেগপূর্ণ সুর আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সেলোর গভীর আর রিচ টোন আর ডাবল বেসের শক্তিশালী বেসলাইন – সব মিলে যেন এক ত্রিমাত্রিক সাউন্ডস্কেপ তৈরি করত। আমি দেখেছি, বারোক যুগে প্রতিটি যন্ত্রের কণ্ঠস্বরকে সম্মান করা হতো, আর তাদের এমনভাবে সাজানো হতো যাতে প্রত্যেকেই তাদের সেরাটা দিতে পারে। এই সুসংগঠিত বিন্যাসই বারোক অর্কেস্ট্রাকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে, যা শুনলে মনে হয় যেন এক বিশাল স্থাপত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রতিটি স্তম্ভই তার নিজস্ব গুরুত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চেম্বার মিউজিকের অন্তরঙ্গতা
বারোক চেম্বার মিউজিক আমার কাছে এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। বড় অর্কেস্ট্রার বিশালতা যেখানে মনকে অভিভূত করে, সেখানে চেম্বার মিউজিকের অন্তরঙ্গতা যেন সরাসরি আত্মার সাথে কথা বলে। কয়েকটি মাত্র যন্ত্র নিয়ে তৈরি এই সঙ্গীতগুলো যেন এক ব্যক্তিগত কথোপকথন, যেখানে প্রতিটি সুর তার নিজস্ব গল্প বলে। আমি যখন বাখের চেম্বার ওয়ার্কস বা কোরেলির ট্রিয়ো সোনাতা শুনি, তখন মনে হয় যেন আমি শিল্পীদের সাথে বসে এক ব্যক্তিগত মুহূর্তের সাক্ষী হচ্ছি। এর মধ্যে কোনো বাড়তি জাঁকজমক নেই, আছে কেবল বিশুদ্ধ সুর আর গভীর আবেগ। এই সঙ্গীতগুলো এতটাই সুক্ষ্ম আর সংবেদনশীল যে প্রতিটি নোটের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা যায়। চেম্বার মিউজিকের এই অন্তরঙ্গতা আমাকে শেখায় যে, বড় আর শক্তিশালী হওয়ার চেয়ে গুণগত মান আর গভীরতা অনেক বেশি জরুরি। অনেক সময়ই আমার মনে হয়, দিনের শেষে যখন ক্লান্তি ঘিরে ধরে, তখন এই চেম্বার মিউজিকই আমার মনকে প্রশান্ত করে, এক ধরনের শান্তি এনে দেয় যা অন্য কোথাও খুঁজে পাই না।
হার্পসিকর্ড থেকে ভায়োলিন: যন্ত্রের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর
বারোক সঙ্গীতে যন্ত্রের ব্যবহার ছিল এক অসাধারণ শিল্প। হার্পসিকর্ড ছিল এই সময়ের প্রধান কিবোর্ড যন্ত্র, যার তীক্ষ্ণ কিন্তু প্রাণবন্ত শব্দ সুরের মাঝে এক নতুন মাত্রা যোগ করত। আমি যখন হার্পসিকর্ডের একক পারফরম্যান্স শুনি, তখন মনে হয় যেন যন্ত্রটি একাই গোটা অর্কেস্ট্রার কাজ করছে, প্রতিটি সুরকে তার নিজস্ব উজ্জ্বলতায় ফুটিয়ে তুলছে। আর ভায়োলিন পরিবার? এই যন্ত্রগুলো ছিল বারোক সঙ্গীতের হৃদয়। ভায়োলিন, ভায়োলা, সেলো আর ডাবল বেস – প্রতিটি যন্ত্রের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ছিল, যা একে অপরের সাথে মিলেমিশে এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করত। আমি দেখেছি, কিভাবে ভায়োলিনের আবেগপূর্ণ সুর আমাদের মনকে নাড়া দেয়, সেলোর গভীর টোন এক ধরনের বিষণ্ণতা তৈরি করে, আর ডাবল বেসের দৃঢ়তা পুরো সঙ্গীতকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি দেয়। এই যন্ত্রগুলোর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরই বারোক সঙ্গীতকে এত বৈচিত্র্যময় আর প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এই যেন এক সঙ্গীত সম্মেলন, যেখানে প্রতিটি যন্ত্র তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলছে, কিন্তু তাদের সম্মিলিত আওয়াজ এক অসাধারণ ঐক্যের সৃষ্টি করছে।
আবেগের গভীরতা আর নাটকের ছোঁয়া: বারোক অপেরার আকর্ষণ
বারোক অপেরা, আহ! এর কথা ভাবলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল মঞ্চ, জমকালো পোশাক আর শক্তিশালী কণ্ঠের শিল্পীরা। আমার মনে হয়, বারোক অপেরা শুধু গান বা অভিনয় ছিল না, এটি ছিল এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা – এক আবেগপূর্ণ যাত্রা যেখানে সুর, নাটক, দৃশ্যপট আর কস্টিউম মিলেমিশে এক জাদুর জগৎ তৈরি করত। আমি যখন প্রথম হ্যান্ডেলের কোনো অপেরা দেখলাম, মনে হচ্ছিল যেন সময় থেমে গেছে, আর আমি কোনো এক অন্য জগতে প্রবেশ করেছি। অপেরার গল্পগুলো প্রায়শই পুরাণ বা ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে নেওয়া হতো, যেখানে প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষমতা আর প্রতিশোধের মতো গভীর মানবিক আবেগগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করত। শিল্পীরা তাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে এই আবেগগুলোকে এতটাই জীবন্ত করে তুলতেন যে দর্শক হিসেবে আমিও সেই আবেগের গভীরে তলিয়ে যেতাম। বিশেষ করে ‘দাকাপো আরিয়া’ গুলো ছিল বারোক অপেরার প্রাণ। একটি আরিয়া তিনবার গাওয়া হতো, যেখানে তৃতীয়বারে শিল্পী তার নিজের মতো করে সুরের অলঙ্করণ যোগ করতেন, যা ছিল এক অসাধারণ উদ্ভাবনী কৌশল। এটি কেবল শিল্পীর কণ্ঠের জাদু ছিল না, ছিল তাদের আবেগ আর সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ। বারোক অপেরা আমাকে শিখিয়েছে যে, শিল্প কতটা শক্তিশালী হতে পারে, আর কিভাবে এটি আমাদের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তুলতে পারে।
অপেরা সেরিয়ার রাজকীয় জাঁকজমক
বারোক অপেরার একটি প্রধান ধারা ছিল ‘অপেরা সেরিয়া’ বা ‘গম্ভীর অপেরা’। এই অপেরাগুলো ছিল রাজা-বাদশাহদের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি, তাই এর প্রতিটি অংশে ছিল এক রাজকীয় জাঁকজমক। আমার মনে পড়ে, অপেরা সেরিয়ার পোশাক, সেট আর আলোর ব্যবহার এতটাই বিলাসবহুল ছিল যে তা দর্শকদের চোখ ধাঁধিয়ে দিত। গল্পগুলো প্রায়শই গ্রিক বা রোমান পুরাণ থেকে নেওয়া হতো, যেখানে বীরত্ব, মহত্ত্ব আর নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো ফুটিয়ে তোলা হতো। এই অপেরাগুলো ছিল সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর কাছে এক ধরনের স্টেটাস সিম্বল। আমি যখন অপেরা সেরিয়ার কোনো ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের ভিডিও দেখি, তখন সেই সময়ের আভিজাত্য আর শিল্পকলার প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা ভেবে মুগ্ধ হই। এই অপেরাগুলো কেবল বিনোদনই ছিল না, ছিল সে সময়ের সমাজ ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আবেগপূর্ণ আরিয়া: কণ্ঠের জাদু
বারোক অপেরার অন্যতম সেরা আকর্ষণ ছিল এর আরিয়াগুলো। আরিয়াগুলো ছিল একক কণ্ঠের পরিবেশনা, যেখানে শিল্পীরা তাদের গায়কী দক্ষতা আর আবেগ দিয়ে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। আমার মনে আছে, প্রথমবার যখন কাস্ত্রাতো ফ্যারিনেল্লির একটি আরিয়া শুনেছিলাম, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। এই আরিয়াগুলোতে শিল্পীরা তাদের কণ্ঠের মাধ্যমে হাসি, কান্না, প্রেম, ক্রোধ – সব ধরনের আবেগ ফুটিয়ে তুলতেন। দাকাপো আরিয়ার যে কাঠামো, যেখানে শিল্পী তৃতীয়বারে সুরের নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতেন, তা ছিল শিল্পীর স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই আরিয়াগুলো শুধু সুমধুরই ছিল না, ছিল নাটকের প্রধান চালিকা শক্তি, যা চরিত্রের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে দর্শকদের সামনে উন্মোচন করত। কণ্ঠের এই জাদু আজও আমাকে মুগ্ধ করে, আর বারোক অপেরার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে তোলে।
ব্যস্ত জীবনে এক টুকরো শান্তি: বারোক সঙ্গীত কেন আজও প্রাসঙ্গিক
আজকের এই ব্যস্ত আর কোলাহলপূর্ণ জীবনে, যেখানে আমাদের মন হাজারো চিন্তা আর ডিজিটাল তথ্যের ভিড়ে অস্থির হয়ে থাকে, সেখানে বারোক সঙ্গীত আমার কাছে এক টুকরো শান্তির আশ্রয়স্থল। আমার মনে হয়, এই সঙ্গীত শুধু কানে শোনার জন্য নয়, এটি যেন আমাদের আত্মাকে এক ধরনের প্রশান্তি দেয়, যা আধুনিক জীবনের স্ট্রেস আর টেনশন থেকে মুক্তি এনে দেয়। আমি নিজে বহুবার অনুভব করেছি, যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি বা শুধু একটু আরাম করতে চাইছি, তখন বারোক সঙ্গীত আমার মনকে ফোকাস করতে আর শান্ত থাকতে সাহায্য করে। এর সুশৃঙ্খল কাঠামো, প্রতিটি সুরের স্পষ্টতা আর গভীর আবেগ – সব কিছু মিলেমিশে এক ধরনের সুস্থিরতা তৈরি করে। এই সঙ্গীত আমাদের অস্থির মনকে এক জায়গায় নিয়ে আসে, আর আমাদের শেখায় যে, জীবনের গভীরে প্রবেশ করলে আমরা কত অফুরন্ত আনন্দ আর শান্তি খুঁজে পেতে পারি। মনে হয়, সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুই বদলিয়েছে, কিন্তু মানুষের মন এবং এর শান্তির প্রয়োজন আজও একই রকম আছে। আর এই প্রয়োজন পূরণ করতে বারোক সঙ্গীত আজও এক অসাধারণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এটি কেবল অতীতের শিল্প নয়, এটি বর্তমানের জন্য এক মূল্যবান উপহার, যা আমাদের আত্মাকে পুষ্ট করে তোলে।
মনকে শান্ত করার অদ্ভুত ক্ষমতা
বারোক সঙ্গীতের এমন এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে যা মনকে নিমেষেই শান্ত করে তোলে। আমি যখন খুব চাপ অনুভব করি বা আমার মনটা খুব ছটফট করে, তখন আমি চোখ বন্ধ করে বাখের কোনো কান্তাতা বা ভিভাল্ডির কোনো কনচের্তো শুনি। মনে হয় যেন সুরের এক শীতল প্রলেপ আমার ভেতরের সব অস্থিরতাকে শান্ত করে দিচ্ছে। এর সুশৃঙ্খল বিন্যাস আর ভারসাম্যপূর্ণ সুরের ধারা আমাকে এক ধরনের শৃঙ্খলাবোধ এনে দেয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীরাও বলেন যে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মনকে শান্ত করতে এবং মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই সঙ্গীত আমার ঘুমের মান উন্নত করেছে এবং আমাকে আরও শান্ত ও স্থিতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এটি কেবল সাময়িক ভালো লাগা নয়, দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সুস্থতার জন্যও এক দারুণ সঙ্গী।
আধুনিক জীবনের কোলাহলে বারোকের আশ্রয়

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে চারপাশে অবিরাম শব্দ আর তথ্য। শহরের কোলাহল, মোবাইলের অবিরাম নোটিফিকেশন, কাজের চাপ – সব মিলেমিশে আমাদের জীবনকে অস্থির করে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে বারোক সঙ্গীত আমার কাছে যেন এক নীরব আশ্রয়স্থল। আমি যখন আমার কাজ করছি বা একটু ব্যক্তিগত সময় কাটাতে চাইছি, তখন এই সঙ্গীত আমাকে বাইরের সব কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক শান্ত জগতে নিয়ে যায়। এর গভীর আর সুসংগঠিত সুর আমাদের মনকে বাইরের বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচিয়ে এক অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এনে দেয়। মনে হয় যেন এই সঙ্গীত আমাদের মনে এক ধরনের প্রাচীর তৈরি করে, যা বাইরের সব নেতিবাচক শক্তিকে দূরে রাখে। এই আশ্রয় আমাকে নতুন করে শক্তি জোগায়, আর জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করার সাহস দেয়।
বারোক সঙ্গীতের লুকানো রত্ন: কীভাবে খুঁজে পাবেন আপনার প্রিয় সুর
অনেকেই মনে করেন, বারোক সঙ্গীত মানেই বুঝি কেবল বাখ, হ্যান্ডেল আর ভিভাল্ডি। সত্যি বলতে, আমিও একসময় তাই ভাবতাম। কিন্তু যখন এই সুরের গভীরে প্রবেশ করলাম, তখন বুঝতে পারলাম যে বারোকের জগতটা আরও কত বিশাল আর বৈচিত্র্যময়! এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য লুকানো রত্ন, অসাধারণ সব সুরকার আর তাঁদের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নিজের প্রিয় বারোক সুর খুঁজে পাওয়াটা এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার, যেখানে প্রতিটি আবিষ্কারই নতুন এক আনন্দ নিয়ে আসে। অনেক সময়ই আমরা শুধু পরিচিত নামগুলোর মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখি, কিন্তু একটু সাহসী হয়ে যদি অজানা কম্পোজারদের কাজ শুনতে শুরু করি, তাহলে অবাক হয়ে যাবো তাদের প্রতিভায়। আজকালকার দিনে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এই অ্যাডভেঞ্চারকে আরও সহজ করে দিয়েছে। ইউটিউব, স্পটিফাই বা বিভিন্ন অনলাইন মিউজিক প্ল্যাটফর্মে আপনি খুব সহজেই বারোক যুগের হাজার হাজার সুর খুঁজে পাবেন। আমি দেখেছি, যখন কোনো নতুন কম্পোজারের কাজ শুনতে শুরু করি, তখন মনে হয় যেন এক নতুন বন্ধুর সাথে পরিচিত হচ্ছি, আর তার জীবনের গল্প শুনছি সুরের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়াটা সত্যিই দারুণ উপভোগ্য, যা আপনার সঙ্গীত রুচিকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং আপনাকে বারোকের এক নতুন দিক দেখাবে।
অজানা কম্পোজারদের মুগ্ধতা
বাখ, হ্যান্ডেল আর ভিভাল্ডি নিঃসন্দেহে বারোকের স্তম্ভ। কিন্তু তাঁদের বাইরেও অনেক অসাধারণ সুরকার ছিলেন, যাঁদের কাজ আজও আমাদের মুগ্ধ করে। ফ্রান্সে জঁ-ব্যাপটিস্ট লুলি, ইতালিতে ডোমেনিকো স্কারলাত্তি, জার্মানিতে জর্জ ফিলিপ টেলেমান – এমন অসংখ্য নাম রয়েছে। আমি যখন প্রথম টেলেমানের চেম্বার মিউজিক শুনি, তখন অবাক হয়েছিলাম তাঁর সুরের বৈচিত্র্য আর স্বকীয়তা দেখে। মনে হচ্ছিল যেন তিনি বাখের মতোই গভীর, কিন্তু তাঁর নিজস্ব একটা স্টাইল আছে। এই অজানা কম্পোজারদের কাজ খুঁজে বের করাটা আমার কাছে এক ধরনের গুপ্তধন খোঁজার মতো। প্রতিটি নতুন সুর যেন এক নতুন আবিষ্কারের আনন্দ নিয়ে আসে। আমি বিশ্বাস করি, তাদের কাজগুলো আজও সমানভাবে মূল্যবান আর প্রাসঙ্গিক। একটু সময় নিয়ে যদি এই লুকানো রত্নগুলো খুঁজে বের করতে পারেন, তাহলে আপনার সঙ্গীত সংগ্রহ নিঃসন্দেহে আরও সমৃদ্ধ হবে।
আধুনিক রেকর্ডিং আর ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের তুলনা
বারোক সঙ্গীত শোনার সময় আরেকটি বিষয় আমাকে খুব আকর্ষণ করে, তা হলো আধুনিক রেকর্ডিং আর ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের তুলনা। আজকাল অনেক শিল্পীই চেষ্টা করেন বারোক যুগের যন্ত্র আর পারফরম্যান্সের স্টাইল ব্যবহার করে ঐতিহাসিক পরিবেশনা তৈরি করতে। আবার কিছু শিল্পী আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বারোক সুরকে নতুন করে ব্যাখ্যা করেন। আমি নিজে উভয় ধরনের পারফরম্যান্স উপভোগ করি। ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স শুনলে মনে হয় যেন আমি সেই সময়েই ফিরে গেছি, আর সেকালের মানুষরা কিভাবে সঙ্গীত উপভোগ করত, তা অনুভব করতে পারি। অন্যদিকে, আধুনিক রেকর্ডিংগুলো বারোক সুরকে এক নতুন রূপে তুলে ধরে, যা বর্তমান শ্রোতাদের কাছে আরও সহজে গ্রহণীয় হয়। আমার মনে হয়, দুটোই তাদের নিজস্ব জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। কোনটি ভালো, তা সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। তবে উভয় ধরনের পারফরম্যান্স শুনলে বারোক সঙ্গীতের গভীরতা আর এর বহুমুখী দিকগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। আমি আপনাদেরও উৎসাহিত করব বিভিন্ন স্টাইলের রেকর্ডিং শুনতে, কারণ এই তুলনা আপনার সঙ্গীত অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
লেখাটি শেষ করার আগে
বারোক সঙ্গীতের এই বিশাল জগতে আমার ব্যক্তিগত যাত্রার কথা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। এই সুরগুলো শুধু কানে বাজেনা, বরং আত্মার গভীরে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে ক্ষণিকের বিরতি নিয়ে যখনই আমি বারোকের সুর শুনি, তখন মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে, আর এক অদ্ভুত শান্তি আমাকে ঘিরে ধরেছে। এটি কেবল কিছু পুরনো সুর নয়, এটি এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা যা আজও প্রাসঙ্গিক এবং আমাদের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এই পোস্টের মাধ্যমে আমি চেষ্টা করেছি আমার ভালো লাগা আর অভিজ্ঞতাগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরতে, যাতে আপনারাও এই সুরের জাদুতে বুঁদ হতে পারেন।
জেনে রাখা ভালো কিছু টিপস
১. নতুন সুরকারদের আবিষ্কার করুন: বাখ, হ্যান্ডেল এবং ভিভাল্ডি অবশ্যই অসাধারণ, তবে জঁ-ব্যাপটিস্ট লুলি, ডোমেনিকো স্কারলাত্তি বা জর্জ ফিলিপ টেলেম্যানের মতো কম পরিচিত সুরকারদের কাজও আপনার সঙ্গীত অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করবে। ইউটিউব বা স্পটিফাইতে তাদের কাজ খুঁজে বের করে শুনুন, দেখবেন নতুন এক জগৎ খুলে গেছে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, এই লুকানো রত্নগুলো প্রায়শই আপনাকে অবাক করবে তাদের বৈচিত্র্যময় সুরের জাদুতে।
২. বিভিন্ন যন্ত্রের প্রতি মনোযোগ দিন: বারোক সঙ্গীতে হার্পসিকর্ড, অর্গান, লাউট এবং ভায়োলিন পরিবারের মতো যন্ত্রগুলির স্বতন্ত্র ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি যন্ত্রের শব্দ আর তার অবদানকে আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করুন, দেখবেন সুরের গভীরতা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন। এটা সুরের এক অন্য মাত্রা এনে দেবে এবং প্রতিটি যন্ত্রের কারিশমা আপনাকে মুগ্ধ করবে।
৩. ঐতিহাসিক বনাম আধুনিক পারফরম্যান্স: একই সুরের ঐতিহাসিক যন্ত্র দিয়ে বাজানো রেকর্ডিং এবং আধুনিক অর্কেস্ট্রা দ্বারা বাজানো রেকর্ডিং উভয়ই শুনুন। দেখবেন দুটি পারফরম্যান্সের মধ্যে কেমন পার্থক্য, যা আপনার অনুভূতি এবং বোঝার ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। এটা সত্যিই দারুণ একটা অভিজ্ঞতা, কারণ এটি আপনাকে সময়ের সাথে সুরের বিবর্তন বুঝতে সাহায্য করবে।
৪. শান্ত পরিবেশে শুনুন: বারোক সঙ্গীতের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে শান্ত এবং নিরিবিলি পরিবেশে শুনুন। এটি আপনাকে সুরের প্রতিটি স্তরকে অনুভব করতে এবং এর গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করবে। আমি নিজে দেখেছি, শান্ত পরিবেশে এই সুরগুলো শুনলে মনোযোগ অনেক বাড়ে এবং এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়, যা আজকের ব্যস্ত জীবনে খুবই জরুরি।
৫. আবেগ এবং গল্প বোঝার চেষ্টা করুন: বারোক সঙ্গীত শুধু সুরের বিন্যাস নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর আবেগ আর গল্প। অপেরা বা কান্তাতার ক্ষেত্রে গল্পের প্রেক্ষাপট জেনে নিলে সুরের প্রতি আপনার টান আরও বাড়বে এবং আপনি শিল্পীর আবেগ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। এটি আপনাকে সুরের সাথে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করবে, কারণ প্রতিটি নোটের পেছনে রয়েছে একটি করে না বলা গল্প।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির সারসংক্ষেপ
বন্ধুরা, বারোক সঙ্গীত কেবল একটি ঐতিহাসিক ধারা নয়, এটি একটি জীবন্ত শিল্প যা আজও আমাদের মন ও আত্মাকে ছুঁয়ে যায়। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি থেকে আমি বলতে পারি, এই সুরগুলি আমাদের ব্যস্ত জীবনে এক টুকরো শান্তি এনে দিতে পারে, মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর সুশৃঙ্খল কাঠামো, আবেগময় অভিব্যক্তি এবং স্বতন্ত্র যন্ত্রের ব্যবহার একে অনন্য করে তুলেছে। জোহান সেবাস্তিয়ান বাখ, জর্জ ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল এবং আন্তোনিও ভিভাল্ডির মতো মহান সুরকারদের কালজয়ী সৃষ্টিগুলি আজও আমাদের মুগ্ধ করে। অপেরা থেকে চেম্বার মিউজিক পর্যন্ত, বারোকের প্রতিটি শাখাই তার নিজস্ব সৌন্দর্য বহন করে। তাই, আমি আপনাদের প্রত্যেককে উৎসাহিত করব, এই অসাধারণ সঙ্গীতের গভীরে প্রবেশ করতে, এর লুকানো রত্নগুলি খুঁজে বের করতে এবং ব্যক্তিগতভাবে এই সুরের জাদু অনুভব করতে। দেখবেন, এটি আপনার দৈনন্দিন জীবনকে আরও অর্থপূর্ণ এবং প্রশান্তিময় করে তুলবে, যেমনটি আমার জীবনে ঘটেছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: বারোক সঙ্গীত আসলে কী, আর এর বিশেষত্বটাই বা কোথায়?
উ: আহা, এই প্রশ্নটা সত্যিই খুব দারুণ! আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, যখন প্রথম বারোক সঙ্গীতের জগতে ডুব দিয়েছিলাম, তখন যেন এক নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছিল। সালটা ছিল প্রায় ১৬০০ থেকে ১৭৫০-এর মাঝামাঝি সময়, আর জন্ম হয়েছিল ইতালির রোম শহরে। তারপর ধীরে ধীরে পুরো ইউরোপে এর জাদু ছড়িয়ে পড়েছিল। বারোক আসলে শুধু কিছু সুরের সমষ্টি নয়, এটা একটা পুরো শৈল্পিক আন্দোলন, যেখানে নাটকীয়তা, উত্তেজনা আর এক ধরনের রাজকীয় জাঁকজমক ফুটে উঠত। শুধু সঙ্গীত নয়, স্থাপত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্যেও এর প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্যাথলিক চার্চ এই ধারাটাকে খুব উৎসাহ দিয়েছিল, কারণ তারা চেয়েছিল শিল্পের মাধ্যমে যেন মানুষের কাছে ধর্মীয় অনুভূতিগুলো আরও গভীরভাবে পৌঁছায়।সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বারোকের মূল আকর্ষণটাই হলো এর গভীরতা আর সমৃদ্ধি। প্রতিটি সুর যেন এক গল্প বলে!
এর কাঠামোটা বেশ জটিল, কিন্তু এর মধ্যে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। বিভিন্ন যন্ত্রের নিজস্ব উজ্জ্বলতা আর তাদের সম্মিলিত ঐক্যতান – সবকিছু মিলে এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করে। অর্কেস্ট্রার বিভিন্ন যন্ত্র যেমন ভায়োলিন, চেলো, হার্পসিকর্ড যখন একসঙ্গে বেজে ওঠে, তখন মনে হয় যেন শিল্পের এক বিরাট উৎসব চলছে। আমি তো যখন বাখের ফুগা বা ভিভাল্ডির কোনো কনসার্টো শুনি, আমার মনটা কেমন যেন শান্ত হয়ে যায়, এক অন্যরকম ভালো লাগায় ভরে ওঠে। মনে হয়, এই সুরগুলো শুধু কানের জন্য নয়, আত্মার খোরাক। এর মধ্যে যে আবেগ আর গভীরতা আছে, তা সময়ের সাথে একটুও পুরনো হয়নি, বরং আজও আমাদের ভীষণভাবে টানে।
প্র: বারোক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুরকাররা কারা ছিলেন এবং সঙ্গীতে তাঁদের অবদান কী ছিল?
উ: বারোক যুগ মানেই যেন কিছু কিংবদন্তী সুরকারের সমাবেশ! তাঁদের ছাড়া তো এই যুগের কথা ভাবাই যায় না। তাঁদের হাত ধরেই সঙ্গীতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। আমার মতে, তাঁদের অবদান শুধুমাত্র সেই যুগেই সীমাবদ্ধ ছিল না, আজও তাঁদের সুর সারা বিশ্বের সঙ্গীতপ্রেমীদের মন জয় করে রেখেছে।প্রথমেই যাঁর কথা বলতে হয়, তিনি হলেন যোহান সেবাস্টিয়ান বাখ। কী অসাধারণ এক সুরকার!
তাঁর সঙ্গীত যেন এক গভীর সমুদ্রের মতো – যত গভীরে যাবেন, তত নতুন কিছু আবিষ্কার করবেন। তাঁর ‘ক্যান্টাটাস’, ‘ব্র্যান্ডেনবার্গ কনসার্টোস’ আর ‘সেন্ট ম্যাথিউ প্যাশন’ – এসব শুধু কিছু সুর নয়, যেন এক একটি আবেগঘন মহাকাব্য। বাখের সঙ্গীতে যে জটিলতা আর আবেগ আছে, তা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া ভার। আমি ব্যক্তিগতভাবে যখন তাঁর কোনো ফুগা শুনি, তখন মনে হয় যেন গণিতের এক অপূর্ব শিল্পরূপ দেখছি, যেখানে প্রতিটি নোট নিখুঁতভাবে সাজানো।এরপর বলতে হয় আন্তোনিও ভিভাল্ডির কথা। তাঁকে তো ‘দ্য কনসার্টমাস্টার’ নামেই ডাকা হতো!
৫০০-এরও বেশি কনসার্টো তিনি রচনা করেছেন, যার মধ্যে ‘দ্য ফোর সিজনস’ (The Four Seasons) তো চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। ভিভাল্ডির সুর শুনলে মনে হয় যেন প্রকৃতির কোলে বসে আছি, প্রতিটি ঋতুর অনুভূতি তাঁর সঙ্গীতে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর সঙ্গীতে যে প্রাণবন্ততা আর গতি আছে, তা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।আর জর্জ ফ্রেডরিক হ্যান্ডেল!
তাঁর ‘মেসায়া’ তো আজও সবার প্রিয়। তাঁর অপেরা, ওরাটোরিও আর স্তোত্রগুলিতে যে বিশালতা আর মহিমা দেখা যায়, তা সত্যিই বিরল। হ্যান্ডেলের সঙ্গীত যেন শ্রোতাকে এক রাজকীয় পরিবেশে নিয়ে যায়। এছাড়া ডোমেনিকো স্কারলাত্তির হার্পসিকর্ড সোনাটাগুলোও ভীষণ জনপ্রিয়, তাঁর ভার্চুওসিক কৌশল আর সোনাটা ফর্মের প্রতি তাঁর মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি বারোক সঙ্গীতকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। আমার মনে হয়, এই সুরকাররা তাঁদের প্রতিভার আলোয় বারোক যুগকে এক অবিস্মরণীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
প্র: আজকের দিনেও বারোক সঙ্গীত কেন এত জনপ্রিয় এবং প্রাসঙ্গিক?
উ: এই প্রশ্নটা আমার খুব পছন্দের! কারণ আজকালকার দ্রুতগতির জীবনেও যখন অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “কেন পুরনো দিনের এই বারোক সঙ্গীত এখনও এত ভালো লাগে?”, তখন আমার মনে হয়, এর উত্তরটা ভীষণ সহজ কিন্তু গভীর। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ব্যস্ততা আর কোলাহলে ভরা পৃথিবীতে যখন মনটা একটু শান্তি চায়, তখন বারোক সঙ্গীতের চেয়ে ভালো বন্ধু আর কেউ হতে পারে না।বারোক সঙ্গীত শুধুমাত্র কিছু ঐতিহাসিক সুর নয়, এটা একটা অনুভূতি। এর আবেদনটা চিরন্তন, কারণ এর গভীরে রয়েছে মানব জীবনের সার্বজনীন আবেগ আর অনুভব। এর জটিল কাঠামো আর গভীরতা আমাদের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে সাহায্য করে, একই সাথে এর সুরের মাধুর্য মনকে এক অসাধারণ প্রশান্তি দেয়। আমি যখন স্ট্রেসে থাকি বা মন খারাপ থাকে, তখন বাখের কোনো ক্যানন বা ভিভাল্ডির মিষ্টি সুর আমার মনকে মুহূর্তেই হালকা করে দেয়। মনে হয় যেন এক অন্য জগতে চলে গেছি, যেখানে শুধু শান্তি আর সৌন্দর্য।আজকের দিনে যেখানে ফাস্ট-ফরোয়ার্ড সঙ্গীতের রমরমা, সেখানে বারোক সঙ্গীত আমাদের কিছুটা থমকে দাঁড়াতে শেখায়, একটু গভীরভাবে অনুভব করতে শেখায়। এর নাটকীয়তা, এর আবেগ, এর জাঁকজমক – সবকিছুই এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। এছাড়াও, আজকাল অনেকে মেডিটেশন বা মনোযোগ বাড়ানোর জন্য বারোক সঙ্গীত ব্যবহার করেন, যা এর চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতার আরেকটা প্রমাণ। এর প্রতিটি নোট যেন এক গল্প বলে, যা আমাদের ভাবনাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাই, আমার মনে হয়, বারোক সঙ্গীত শুধু কালের সাক্ষী নয়, এটা আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আজও আমাদের নতুন করে বাঁচতে শেখায়।






